লাইফস্টাইল

মানুষের রাগের সুবিধাগুলো কি কি ? কতটা রাগ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?(তরুণ কুমার বসু)

(তরুণ কুমার বসু,কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট এবং সাংবাদিকতা করেন মেইনস্ট্রিম মিডিয়া হাউসে নিউ দিল্লিতে।তিনি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং যুক্ত আছেন বেশ কিছু ডিজিটাল এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সাথে)

তরুণ কুমার বসু:- মানুষের রাগের সুবিধাগুলো কি কি ? কতটা রাগ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?রাগ হলে সাধারণত আপনি কী করেন? বিভিন্ন উপায়ে রাগ প্রকাশ করেন, নাকি মনের ভেতর সেই রাগ পুষে রেখে নিজের শরীরকে অসুস্থ করে তোলেন ? রাগের ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। সত্যই ক্ষতিকর। রেগে গেলে আপনার স্নায়ুতন্ত্র থেকে শক্তিশালী রাসায়নিক নির্গত হয়। এর ফলে আপনার হৃৎস্পন্দন যেমন বেড়ে যায় তেমন শ্বাস-প্রশ্বাসও খুব দ্রুত হয়ে যায়। এ ছাড়া রক্তচাপ বাড়ে এবং মাংসপেশিতেও টান ধরে। গৌতম বুদ্ধের এক সতর্ক বাণী “তোমার রাগের জন্য তোমাকে শাস্তি দেওয়া হবে না, তোমার রাগই তোমাকে শাস্তি দেবে।”যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাগ সব সময় খারাপ নয়। কখনো কখনো রাগ উপকারী বিষয়ও হয়ে উঠতে পারে। তবে তার জন্য দরকার রাগের উপর আপনার নিয়ন্ত্রণ। তা না হলে জীবনে সুখী হওয়া কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। মানুষ হাসিখুশি থাকলেই কি সুখী হয়? এ প্রশ্ন অনেকের। সাধারণত যেসব মানুষ হাসিখুশি থাকে তাদের সুখী বলে মনে করা হয়। কিন্তু গবেষকরা বলছেন অন্য কথা , শুধু হাসিখুশি থাকলেই মানুষ সুখী হয় না। অনেক সময় রাগ এবং ঘৃণা প্রকাশ করেও মানুষ সুখী হতে পারে। গবেষকরা আরও বলছেন, নেতিবাচক আবেগ প্রকাশের মাধ্যমেও মানুষ অনেকসময় সুখী হতে পারে।বিশ্বখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টোটল বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি সঠিক বিষয়ের ওপর এবং সঠিক ব্যক্তির ওপর ও আরও স্পষ্টকরে বলতে হলে সঠিকভাবে প্রয়োজন মতো বিষয়ের ওপর রেগে যায় তিনি প্রশংসিত হন।’সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা যায় – রাগ এবং ঘৃণা – শব্দ দুটি সুখের সাথে একত্রে মিশে আছে।কিন্তু অন্য নেতিবাচক অনুভূতি যেমন, ভয়, বিষাদ এবং উদ্বেগ, মানুষের সুখের ক্ষেত্রে কতটা কাজ করে সে বিষয়ে কোন ধারণা পাওয়া যায়নি। মানুষের রাগের ক্ষতিকর দিকগুলো তো আমরা জানি। রেগে আগুন হলে তো আর কথাই নেই। মুখে যা আসে তাই বলে দেন। কাঁচের জিনিসপত্র নিয়েই তখন একটু বেশি চিন্তা হয়। ঝনঝন করে ভাঙার শব্দ হয় আর তারপর রাগ একটু অস্তমিত হলেই ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো নিজেকেই পরিষ্কার করে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হয়। এইসব কাজকর্ম করা যাবে কিন্তু রাগ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না? সেটা করতে পারলে তো কাঁচের জিনিসপত্রগুলো একটু রেহাই পায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন একটু আধটু রাগ করা যেতেই পারে। কিন্তু রাগের মাপকাঠি কি হবে, এটা তো কারোর জানা নেই। কিন্তু এটা ঠিক যে, যতটুকু রাগ করলে নিজের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে ততটুকু রাগ করা যায়। হয়তো দেখা গেল লাগামহীন রাগের চোটে এমন কিছু একটা বলে বা করে বসলেন যে পরবর্তী সারাজীবন তার মাশুল দিয়ে যেতে হলো,এমন রাগ করা যাবে না। অর্থাৎ যদি দেখেন যে আপনার রাগের পারদ একটু একটু করে চড়ছে,তাহলে তৎক্ষণাৎ নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন। অন্যদিকে এটাও ঠিক, আপনি যদি সব কিছু হাসি মুখে মেনে নেন, তাহলে আশপাশের মানুষ সেই সুযোগ কাজে লাগাবে এবং তাতে আপনার একটি দুর্বল পারসোনালিটি তৈরি হতে পারে। তাই একটু আধটু লোকদেখানো রাগ থাকা দরকার। সবক্ষেত্রেই তো আর নরম হলে চলে না।গবেষণা বলছে, একজন মানুষ সাধারণ ভাবে সপ্তাহে গড়ে তিন-চারবার রেগে যান। কিন্তু এই ঘটনা যদি প্রতিদিন তিন-চারবার ঘটে, তখন সচেতন হওয়া প্রয়োজন। রাগ করলে কি কি সুবিধা হয় :রাগ আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে আমাদের সীমানা লঙ্ঘন করা হয়েছে। আমাদের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে না এবং এই বিষয়টি নিয়ে কিছু করার সময় এসেছে। এটি অবশ্যই রাগ করার সুবিধা। আমাদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় যে রাগ এবং অন্যান্য নেতিবাচক আবেগগুলো জীবনে খারাপ ভূমিকা পালন করে এবং অন্যের কাছে কখনোই তা প্রকাশ করা উচিত নয়। কিন্তু অন্যান্য নেতিবাচক আবেগের মতো রাগ সবসময় ক্ষতিকর নয়। বরং এটি মনে বা শরীরে পুষে রাখাই ক্ষতিকর। বরং রাগ হলে তা প্রকাশ করাই উত্তম। এটি একটি স্বাস্থ্যকর আবেগ।রাগ ব্যবস্থাপনার আরেকটি সুবিধা হল যে এটি আপনাকে আপনজনের কাছাকাছি যেতে সাহায্য করে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাগ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনে রাগ একটি সাধারণ ব্যাপার। রাগের বহিঃপ্রকাশ যদি ঠিকঠাক থাকে, তাহলে সম্পর্ক শীতল থেকে উষ্ণতম হয়। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এর কথায় -“রাগে যা শুরু হয় তা লজ্জায় শেষ হয়।” রাগ করলেই যে ভীষণ ঝগড়া-মারামারি করতে হবে কিংবা মুখ দেখাদেখি বন্ধ করতে হবে এমন কোনো মানে নেই। বরং রাগ মানে হলো যে বিষয়টি আপনার পছন্দ নয় তা ঠারে ঠারে বুঝিয়ে দেওয়া। ভদ্রভাবেই তা করা যেতে পারে। এমনটাই স্বাস্থ্যকর। রাগ চেপে রাখলে সেখান থেকে মানসিক ও শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাই রাগ হলে তা ভদ্রভাবে প্রকাশ করুন।মনের মধ্যে রাগ ধরে রাখলে তা ধীরে ধীরে অস্বস্তিও বাড়িয়ে তোলে। অন্য কারও ওপর জমতে থাকে ঘৃণা – বিতৃষ্ণা। এরপর একদিন না একদিন তা বিস্ফোরিত হয়ই। তাই রাগ ধরে না রেখে যে কারণে বা যার ওপর রাগ জমেছে তাকে হালকা রাগ দেখিয়ে বলে দেওয়াই ভালো। এতে সহজেই সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু রাগ জমিয়ে রাখলে তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ানোর একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *