সুবিধা*বা*দী………………….
এই বাংলা 24, অঙ্কন সরকার:-

(অঙ্কন সরকার)
কাল ফিরছিলাম সুকিয়া স্ট্রিট থেকে সালকিয়ায়। আহিরীটোলা থেকে বাঁধাঘাটের লঞ্চে চড়ার পর থেকে মজার সব টুকরো টাকরা কুড়োচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম ‘আহা, এই না হলে প্রতিবাদের বাংলা!” একদল ছোকরা দেখলাম কপালে বেশ করে হলুদ-সিঁদুর লেপে লঞ্চে উঠেছে। বুঝলাম ওরা ভক্তকুল। পরক্ষণেই ভাঙ্গলো ভুল। শুনলাম বাক্যালাপ করতে গিয়ে প্রায় প্রত্যেক বাক্যেই একে অপরের মাতৃ দেবীকে স্মরণ করছে। অবশ্য সে ভাষা বেশ স্মরণীয় হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যে বর্ণনীয় নয়। কিছু মানুষকে দেখলাম একটু অস্বস্তিতে গঙ্গার দিকে উদাস ভাবে তাকিয়ে থাকতে, কেউ কেউ অতি কষ্টে আত্মসংযমের পরীক্ষা দিচ্ছেন, আর অনেকে আমার মতোই নিরুত্তাপ সব শুনেও না শোনার ভান করছিলাম। হ্যাঁ, ঠিক তাই করছিলাম, একদম ইচ্ছে করেনি প্রতিবাদ করতে। কেন করতাম, জানা আছে তো পাশে কারো কে পেতাম না।
বেশিদিনের পুরানো তো নয় ঘটনাটা,মাত্র সপ্তাহখানেক আগেই এরকম সন্ধ্যাবেলায় একই পথে ফিরছিলাম। লঞ্চ থেকে নেমে টোটোতে চড়েছিলাম বাড়ি ফিরবো বলে। টোটোতে বসার পরেই টের পেলাম যাত্রীরা আর.জি.কর-এর ঘটনা নিয়ে বেশ সচেতন এবং প্রতিবাদী। দুজন তো বেশ গর্বিত কারণ তারাও নিজেদের ‘বৌ’ কে নিয়ে রাত দখলে সামিল হয়েছিলেন। শুনে ভালো লাগলো। কিন্তু আমার মন বারবার চলে যাচ্ছিলো সামনের টোটোচালক ও তার সঙ্গীর দিকে। অনর্গল পাখির মতো কিচির-মিচির করে রাস্তায় চলা মহিলাদের অ্যানাটমি নিয়ে নানান বিজাতীয় শব্দের প্রয়োগ করে চলছিলো ওই দুজন। অদ্ভুত একটা জ্বালা শুরু হলো শরীরে। চোখ বুলিয়ে নিলাম বাকি তিন সহযাত্রীর দিকে। চোখে চোখ পড়তে দুজন রাত-জাগা আন্দোলনকারীর মুখভঙ্গিতে হতাশার ছাপ দেখলাম। হঠাৎ দেখলাম সামনের দুজন বেশ বেপরোয়া হয়ে মেয়েদের উদ্দেশ্যে নানা মন্তব্য করা শুরু করলো সরাসরি। দপ্ করে মাথায় আগুন চড়ে গেলো। চিৎকার করে টোটো-চালককে জিজ্ঞাসা করে ফেললাম, ‘ঘর মে মা সে ভি এ্যায়সে হি বাত করতে হো ক্যা?’ পাল্টা যে ভাষায় উত্তর এলো তার জন্য প্রস্তুত যে একেবারে ছিলাম না তা নয়। কিন্তু শেষ দেখতে চাইছিলাম এটার। গলা না নামিয়েই ওদেরকে এইধরণের কথাবার্তা বন্ধ করতে বললাম। কিন্তু ওরা দমার পাত্র নয়, আর একের বিরুদ্ধে দুই হয়ে ওরা দমবেই বা কেন? হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, ‘একের বিরুদ্ধে দুই।’ কারণ এক্ষেত্রে তখনও বাকি সহযাত্রীরা চুপ। তবুও লড়াই চালালাম। ওদের পুলিশে ধরিয়ে দেবার ভয়ও দেখালাম। এবার মুখ খুললো সহযাত্রীরা। প্রতিবাদের সুর পেলাম ওদের গলায়। আর প্রতিবাদ করবে নাই বা কেন? এই বচসায় ওদের বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছিলো যে। আমাকে বোঝাতে শুরু করলো ওরা, ‘ছাড়ুন না দাদা, এরা এরকমই। এদের বলে কোনও লাভ নেই, রাস্তায় মেয়েদের বলেছে তো। ওরা হয়তো শুনতেও পায়নি, আপনি কেন শুধু শুধু শত্রু বাড়াচ্ছেন?’
একজন তো টোটো চালানো ছেলেটিকে বলেই বসলো, ‘ছোড় না ভাই, চল চল, বন্ধ কর ঝগড়া, দাদা এ্যায়সেই বোল দিয়া। হটা ইস বাত কো, জলদি চল, দের হো রহি হ্যায়।” বোঝো কান্ড এরা ‘রাত-দখল’ করতে নেমেছিলো!
লঞ্চ ঘাটে লাগলো, সামনে এগিয়ে আবার চড়বো কোনো টোটোতে। কিন্তু আজ মনকে বলেই রেখেছি, ‘যাই হয়ে যাক, প্রতিবাদী হবার বীরত্ব আর দেখিও না।’ লোকে সুবিধাবাদী বলে বলুক, কিচ্ছু যায় আসে না, চুপ করেই থাকবো। যেমন করে অনিতা দেওয়ানের সময় ছিলাম, তাপসী মালিকের সময় ছিলাম।
তাই এখনও চুপ থাকবো, সাব্বির আলি তো আর আমার কেউ হয় না! তাছাড়া ওকে তো আর ধর্ষণ করা হয় নি। গণপ্রহারে মৃত্যু হয়েছে মাত্র, তাও আবার ভিন্ন-প্রদেশে।
তাই ‘সুবিধাবাদী’ আমি চুপ করেই থাকবো।

একদম বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বাস্তবটা লিখেছিস। সত্যিই এটাই আসল সত্য
হ্যাঁ রে, এটা আমার সঙ্গে সত্যিই ঘটেছে।