জাতীয়দুনিয়ালাইফস্টাইলসাহিত্য সংস্কৃতি

মহৎ উদ্বেগে উদ্বোধন: ওড়িশার জগন্নাথ দেবের মূল্যবান রত্নভাণ্ডার

অমৃতা ব্যানার্জী,এই বাংলা 24:- ছোটবেলায় মা , ঠাকুমা র কাছ থেকে শুনে আসা নানান রূপকথার গল্পের মধ্যে ‘গুপ্তধনের সন্ধান ‘ সম্পর্কে ছোট থেকে বড়ো সবাই কৌতুকপূর্ণ। গুপ্তধনের সন্ধান সম্পর্কে বর্তমানে নানা গল্পের বই থেকে শুরু করে বিখ্যাত চলচিত্র রয়েছে। আজ ঠিক ৪৬ বছর পর সেরকমই গুপ্তধনের রহস্য উদঘাটনের সাক্ষী রইলো সমগ্র দেশবাসী,যেটি পরিচিত জগন্নাথ দেবের রত্নভাণ্ডার নামে। যেটি সুরক্ষিত রয়েছে ওড়িশায় অবস্থিত ঐতিহ্যময় ও প্রাচীনতম ৮০০ বছর পুরনো জগন্নাথ মন্দিরে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রত্নভাণ্ডারে কী আছে? উন্মোচিত হবে রত্নভাণ্ডারের মণিমাণিক্যের রহস্য? রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে সাজো সাজো রবের মধ্যেই মহাপ্রভুর ঐশ্বর্যের ভাণ্ডারের রহস্য নিয়ে সরগরম পুরী।অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটলো ১৪ জুলাই রবিবার।ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১ টা বেজে ২৮ মিনিট।সেই মাহেন্দ্রক্ষণ তিথি অনুসারে খুলে গেলো জগন্নাথ দেবের রত্নভাণ্ডারের দরজা। সেখানে রয়েছে প্রভু জগন্নাথ দেব, প্রভু বলরাম দেব ও দেবী সুভদ্রার বিশেষ রত্নভাণ্ডার। মন্দিরের ভেতর ওড়িশার হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি বিশ্বনাথ রথ সহ রাজ্য সরকারের ১১ জন সদস্য প্রবেশ করেছিলেন। কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন পুরীর বর্তমান রাজা গজপতি মহারাজা দিব্যসিংহ দেব। ভাণ্ডারর তালা ভেঙে প্রবেশ করেন তারা।ভাণ্ডার কক্ষ দেখে বেরোতে সময় লেগেছে প্রায় ৩ঘন্টা।ঐতিহাসিক রত্নাগারে বহু শতাব্দী ধরে দেবতা ভগবান জগন্নাথকে দেওয়া অমূল্য অলঙ্কার, গহনা এবং বৈদুর্যমণি, নীলকণ্ঠমণি-সহ একাধিক মূল্যবান রত্ন রয়েছে জগন্নাথধামের ভাণ্ডারে,দাবী পাণ্ডাদের। এই গোপন সম্পদের চারিদিকে কুন্দলিবধ্য ভাবে সাপের পাহারা দেওয়ার কাহিনী প্রচলিত রয়েছে নানান হিন্দু ও বৌদ্ধ স্থাপত্যকে ঘিরে। জগন্নাথ দেবের রত্নভাণ্ডারও তার ব্যতিক্রম নয়। কথিত আছে মন্দিরের রত্নভাণ্ডারের ভেতর থেকে শোনা যায় সাপেদের শব্দ। সেই সময় কী সত্যিই জগন্নাথদেবের ‘বিবিধ রতন’ পাহারা দিচ্ছিল নাগদেবতা?এই বিষয় জল্পনা রয়েছে বহু মানুষের মনে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রত্নভাণ্ডারকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল দীর্ঘদিনের।

এই রত্নভাণ্ডার দুই ভাগে বিভক্ত, ১)বাহির ভাণ্ডার ২)ভিতর ভাণ্ডার। দু’টি কক্ষের ভিতরেই রাখা থাকে প্রভু জগন্নাথ,প্রভু বলভদ্র এবং দেবী সুভদ্রার অলঙ্কার ও রত্নসামগ্রী। ঠাকুরের ব্যবহারকারী আভূষণ থাকে বাহির ভাণ্ডারে। আর ভিতর ভাণ্ডারে থাকে মূল্যবান অলঙ্কার সামগ্রী। বছরে ১৫ দিন বাহির ভাণ্ডার খোলা হয়, বন্ধ থাকে ৩৫০ দিন। বহু বছর খোলা হয়েনি মন্দিরের ভিতর ভাণ্ডার। ১৯৭৮ সালে শেষবার খোলা হয়েছিল এই রত্নভাণ্ডার এবং সেই রত্নসামগ্রীর তালিকা তৈরী করা হয়েছিল যা বানাতে সময় লেগেছিল ৭০ দিন। ১৯৮৯ সালে আংশিকভাবে পরিদর্শন করা হয়েছিল এই রত্ন ভাণ্ডার। ভাণ্ডারের সাতটি কক্ষ রয়েছে যার মধ্যে তিনটি খোলা সম্ভব হয়েছে। ১৯৮৫ সালে, এএসআই কিছু মেরামতের কাজ করার জন্য মন্দিরের ভিতরের কক্ষটি খোলার চেষ্টা করেছিল। তবে মাত্র দুটি ঘর খোলা সম্ভব হয়েছিল।এই ধরনের প্রচেষ্টা এপ্রিল মাসের ২০১৮ সালে করা হয়েছিল যখন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) এর তিন সদস্য সহ ১৬ জন সদস্যের একটি দল ভিতরের ভাণ্ডারে প্রবেশ করতে পারেনি কারণ ঘরের চাবি পাওয়া যায়নি এবং কোনও কারণে মাত্র ৪০ মিনিটের মধ্যই সেই অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ক্ষমতায় এসে ফের রত্ন ভাণ্ডারের অডিট করার সিদ্ধান্ত নেয় ওড়িশার নতুন সরকার। কী কী রয়েছে সেই ঐতিহ্যময় ভাণ্ডারে? ১৯৭৮ সালের সামগ্রী তালিকা অনুযাই গুপ্তধনের বাহির ভান্ডারে রয়েছে প্রায় ১২৮৮৩ ভরি ওজনের ৪৫৪ ধরনের সোনার অলঙ্কার এবং ২২১৫৩ ভরি ওজনের ২৯৩ ধরনের রুপোর অলঙ্কার।ওড়িশা রিভিউ ম্যাগাজিন অনুসারে, ভিতরের চেম্বারে ১৮০ ধরনের অলঙ্কার রয়েছে,যার মধ্যে ৭৪ ধরনের খাঁটি সোনার অলঙ্কার রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির ওজন ১.২ কিলোগ্রামেরও বেশি।দরজা খুললেও কাটল কি রহস্য ? মন্দির চত্বরে ব্যবস্থা করা হয়েছিল কড়া নিরাপত্তার। বহু দিন ধরে রত্নভাণ্ডার বন্ধ থাকায় এবং জগন্নাথদেবের মূল্যবান রত্ন পাহারা দেয় সাপেরা, এই প্রচলিত কথা মাথায় রেখে মন্দির চত্বরে মোতায়েন করা হয় সাপ বিশেষজ্ঞদের। তবে সেখানে সেই দৃশ্য দেখা যায়নি বলেই দাবি করেন কমিটি।বিচারপতি বিশ্বনাথ রথ জানিয়েছেন , যেহেতু মন্দির পরিচালনার সঙ্গে সাত থেকে আট জন ব্যস্ত ছিলেন উল্টো রথ যাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে, তাই রত্নভাণ্ডারের অলঙ্কারগুলি গোনা যায়নি। পরীক্ষা করে দেখা যায়নি। সেগুলি স্থানান্তরের জন্য বেশি সময়ও পাওয়া যায়নি। তাই তারা দেবতাদের অলঙ্কার এবং মূল্যবান পাথর স্থানান্তরের জন্য আরেকটি তারিখ নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

অমৃতা ব্যানার্জী,সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, বিদ্যাসাগর কলেজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *