কলকাতাজাতীয়জেলারাজনীতিরাজ্য

বিচারের বাণী নাকি মসনদের চাবি!!(অঙ্কন সরকার)

(অঙ্কন সরকার)

এই বাংলা 24:-“এরকম তো কতই হয়।  সমাজবিরোধী কাজ,ডাকাতি, মারধর।  আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে বলতে হবে কেন?” বক্তা পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসু।সময় ১৯৯০ সালের ১জুন।প্রসঙ্গ ৩০ মে ঘটে যাওয়া বানতলায় রাজ্য সরকারি মহিলা অফিসার অনিতা দেওয়ানের ধর্ষন ও হত্যাকাণ্ড।পিশাচরা সে’দিন মৃতদেহকেও নিষ্কৃতি দেয়নি।মৃতার যৌনাঙ্গে টর্চ গুঁজে দেওয়া হয়েছিল।আরো তিনজন সে ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন।অদ্ভুত ব্যাপার হলো ময়নাতদন্তের পর মৃতদেহ পরিবারের হাতে দেওয়ার আগে তৎকালীন শাসকদলের রাজ্য দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।কারণ আজও অজানা।দুর্বোধ্য কারণে অপরাধীদের শনাক্ত করা যায় নি।

সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া পৈশাচিক বর্বরতাকে আড়াল করার জন্য এই উদাহরণ নয়।কারণ এ ধরনের ঘটনা মানবাধিকারের উপর চরম আঘাত।  তবুও এই ঘটনা এবং তাকে কেন্দ্র করে ঘটে চলা ঘটনাক্রম বারবার অতীত মনে করাচ্ছে।এ অপরাধ তো প্রথম বা ব্যতিক্রমী নয় মোটেও।  নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েই চলেছে। কখনো শিকারের নাম বিলকিস বানো, কখনো অরুণা শাহবাগ,কখনো রিজওয়ানুর রহমান,কখনো স্বপ্নদীপ কুন্ডু,  কখনো সুদূর আমেরিকার জর্জ ফ্লয়েড আবার কখনো সাম্প্রতিক “অভয়া” দেবনাথ।এই সব ঘটনাই তো মানবাধিকারের ধর্ষণ।তাহলে প্রতিবাদে রাত দখল করার অধিকার কেন শুধুই নারীদেরই থাকবে?পুরুষ মাত্রেই কি তবে ধর্ষক?  তাহলে সকল জন্মই কি ধর্ষকামের ফলশ্রুতি!  কেন শুধুই মানুষ হিসেবে প্রতিবাদ করবো না?  নাকি লিঙ্গভেদ করতে পারলে কিছু তথাকথিত “নারীবাদী বা বিরুদ্ধ-মতবাদীদের” উপার্জনের কিছুটা সুবিধা হয়?

প্রতিবাদ হবে বৈকি,মতভেদও থাকতে পারে,কিন্তু মূল দাবি তো হওয়া উচিত অপরাধী বা অপরাধীদের চরম শাস্তি।তার জায়গায় কেউ চাইছেন গদির দখল,কেউ কেউ আবার হেলিকপ্টার তৈরী করতে বলছেন।তা বলতেই পারেন,বলুন,কিন্তু এতে কি ওই বোনটির আত্মা বিচার পাবে?  

আমার তো মনে হচ্ছে কারোর সর্বনাশ আর কারোর পৌষমাস।নির্মমভাবে সন্তান হারালেন দেবনাথ দম্পতি আর সেই ঘটনা নিয়ে “দম-মারো-দম” করছেন কিছু রাজনৈতিক কীট।  তাদের কেউ কেউ শিং ভেঙে ছাত্র-আন্দোলনে ঢুকে পড়ছেন।কেউ আবার রাত দখলের কর্মসূচীতে সাদা পোষাক পরে সাজুগুজু করে এক চোখে কাঁদছেন।তা কাঁদুন ক্ষতি নেই,মাঝে মাঝে জল বেরোলে চোখ পরিষ্কার হয়।তাতে মনের দৃষ্টি পরিস্কার না হলেও চোখের নজর একটু বাড়ে বৈকি।আর ওই নজরটাই তো শকুনের মূল সম্পদ।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু প্রথম দিন থেকেই অপরাধীর চরম শাস্তির দাবিতে মুখর, ঠিক যেমন করে হেতাল পারেখ হত্যাকাণ্ডে ধনঞ্জয়ের ফাঁসির দাবিতে পথে নেমেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী-জায়া মীরা ভট্টাচার্য।সেই প্রতিবাদের উদ্দেশ্য নিয়ে কই এতো কথা তো ওঠেনি।অথচ এখন প্রতিবাদের মঞ্চ থেকে কোথাও কোথাও মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের মহিলাদের সম্ভ্রম নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য উড়ে আসছে।  

কেউ কোনো প্রশ্ন করছে না কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে,অথচ মাত্র চারদিনে অন্ততঃ একজন প্রত্যক্ষ অপরাধীকে গ্রেফতার করা রাজ্য-পুলিশের ঘাড়ে দায় চাপাতে পারলেই কেল্লা ফতে।

কিছু অতি বোদ্ধা পুরো ঘটনাটার পূণর্নিমাণ করে ফেলছেন মানসচক্ষে,কেউ কেউ নিজের ছবিতে কালো টিপ পরাচ্ছেন।তা পরান,আপনার ছবি আপনি লাল,সাদা,কালো যা খুশি করুন।কিন্তু গোটা সমাজকে ব্ল্যাক-আউট করার এমন অল আউট প্রয়াস কেন?

প্রমাণ লোপাটের কথা যে সব মানুষ বলছেন, তারা কিন্তু অনেকেই তখন যুবক যখন কর্তব্যরত ডি. সি. (পোর্ট ) বিনোদ মেহতার নির্মম হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া আততায়ী ইদ্রিস আলির পুলিশ হেফাজতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়।সত্যিই কি ঠুনকো মানুষের স্মৃতিশক্তি!  

একশ্রেণীর চিকিৎসকতো “খুনের বদলে খুন” নীতি নিয়েছেন।নাহ, এ’কথা তাঁরা উচ্চারণ করেন নি,কিন্তু লাগাতার কর্মবিরতি কত মুমূর্ষু মানুষের মৃত্যুর কারণ ঘটছে সে খবর তাঁরা রাখছেন কি?

সন্তানহারা দেবনাথ দম্পতি বিচার চাইছেন,অথচ গজিয়ে ওঠা সমব্যথীর দল ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন।যার ব্যথা তারই থাকে, সমব্যথী বলে কিছু হয় না আমার মতে।কেউ এ দেশকে সন্তান প্রসবের অযোগ্য মনে করছেন, কেউ আবার মুখ্যমন্ত্রীকে হেলিকপ্টার প্রস্তুত করার নিদান দিচ্ছেন।অনেকটা ওই “ঘেঁটে ঘুঁটে দে মা শ্যামা লুটে পুটে খাই” অবস্থা।মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের তৎপরতাকেও বক্র দৃষ্টিতে দেখছেন কেউ কেউ।

লিখতে বসলে আরো কত কিই তো লেখা যায়।  তবে সে’সব না’হয় আবার পরে লেখা যাবে।  আপাতত শুধু একটাই দাবি প্রকৃত অপরাধ হেরে যাক,জিতুক মানবিকতা।

শুধু এটুকু বলে দিই,কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো নিরপেক্ষতায় আমার বিশ্বাস নেই,তাই স্বাভাবিকভাবেই আমিও নিরপেক্ষ নই।তবে কোনো দলের হয়ে কলম ধরার কোনো দায় আমার নেই,কারণ এই কলমটা আমার নিজের পয়সায় কেনা।তাই লেখার দায় এবং বক্তব্যের দায়িত্ব একান্তই আমার।ভবিষ্যতেও মন চাইলে আবার লিখবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *