সাহিত্য সংস্কৃতি

কবে আসবে (ভৌতিক গল্প)লেখক:-অনিন্দ্য শঙ্কর রায়

অনিন্দ্য শঙ্কর রায়, প্রাক্তন আইটিএস, প্রাক্তন বরিষ্ঠ পদাধিকারী যোগাযোগ মন্ত্রক

হেরম্বনগর আমার পৈত্রিক গাঁ বলে সেখানকার শ্মশানটা আমি বহুবার দেখেছি ৷ এখানেই আমার জন্ম।এদেশে বড় হওয়া , আদিবাড়িও এ-গাঁয়েই । তবে আজকাল আর গ্রামে থাকি না পাকাপাকিভাবে বাসা বেঁধেছি কলকাতায় ৷ কিন্তু এমন মন্দ কপাল, যে আজ যখন ফিরছিলাম মালদা থেকে বাড়ি; হঠাৎ শ্মশানের কাছে এসে আমার গাড়িটা বিগড়োলো ! মুস্কিলের একশেষ ৷ সন্তু বিশ্বস্ত চালক ; সে বলল ” মনে হচ্ছে স্যার গাড়ির ব্যাটারিটা গোলমাল করছে । আপনি বসুন আমি নেমে দেখছি কোনও পেট্রল পাম্পে খুঁজে ডিস্টিলড ওয়াটার পাই কিনা ? কোনওমতে গাড়িটা স্টার্ট দেওয়াতে পারলেই আমরা বাড়ি পৌঁছে যাব ৷” কাছাকাছি একটা পাম্পের খবর জানা ছিল , তার সন্ধান দিলাম ড্রাইভার সন্তুকে ৷ সেইমতন সে চলে গেল ৷ আমি আর একা বসে কী করব , তাই গাড়ি থেকে নেমে পদচারণা শূরু করলাম শ্মশান-সংলগ্ন পথ ধরে ৷ কিছুক্ষণ এভাবে হাঁটবার পর নানান ঘটে যাওয়া পুরানো স্মৃতি হানা দিল মনের অন্দরে ৷ এই শ্মশান আমার অতি কাছের ;বলা যায় এর সঙ্গে আমার একটা পারিবারিক ঘণিষ্ঠ সম্পর্ক ! এই মাটিতেই আমি পরিণত বয়সে বাবা এবং মা দুজনকে দাহ করেছি ৷ ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিল যে দাদা ; তারও একদিন চিতা জ্বলেছিল এই শ্মশানের বুকে ! তবু আজ এতকিছুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে শ্যামলীর কথা ৷ শ্যামলী এখানকার ইতিহাসের মাস্টারমশাই অর্ধেন্দুশেখরবাবুর মেয়ে ৷ বি এ ক্লাসে পার্ট টু পড়তে পড়তে সে হঠাৎ বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল ! তাকে পোড়াবার দিন আমিও শ্মশানে এসেছিলাম অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ; চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলাম চিতার পাশে ৷ সূর্য ডুবে সন্ধা নেমেছে , এপ্রান্ত জনমানবশূন্য । বিনা প্রয়োজনে আজকের দিনে কেউ এমুখো হবে না কারণ দেশশুদ্ধ মানুষ আজ উৎসবে মেতেছে ৷ মাঠ পেরিয়ে ওপার থেকে স্পষ্ট ভেসে আসছে মাইকের গান । এখন তো দুর্গাপূজার মরশুম ! হ্যাঁ আজই নবমী ৷৷এর মধ্যে যে সরকারী ডাক্তারটি যাবতীয় ভোগ-বিলাস বিসর্জন দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পথে নেমেছে সেই ডাক্তার হচ্ছি আমি ৷ ছুটে চলেছি মানুষের সেবায় এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত , অন্য এক জীবনের সন্ধানে ! হ্যাঁ কী যেন বলছিলাম ? শ্যামলী আমার বান্ধবী ছিল বটে , কিন্তু ঠিক কীরকম বান্ধবী , এইমুহূর্তে সেটার ব্যাখ্যা দেওয়া একটু কঠিন ! সে আমার জন্য বিষ খেয়েছিল নাকি গনেশের জন্য ; এর উত্তরটা আজও অজানা ! ভবিষ্যতেও অজানা থাকবে ! যাক এই মুহূর্তে ওসব খুঁজে লাভ নেই এবং ভেবেও আর কাজ নেই ৷ বস্তুত সেসব স্মৃতি আমাকে প্রায়ই পীড়া দেয় এবং এখন শ্মশানে এসে আরও দিচ্ছে ৷ বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে সমস্ত বিগত দিনের ইতিহাস ৷ হঠাৎ চমকে তাকালাম , পিছনে কে একটা লোক আসছে না ? হ্যাঁ ঝাঁকরা চুল দুলিয়ে একজন রোগা সিরিঙ্গে মতন লোক পা টিপে আমার পিছু পিছু আসছে ! আমি ঘুরে তাকাতেই সে মুখোমুখি পড়ে গেল ৷ কিন্তু লোকটা আমাকে দেখে বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে বলল “কি ব্যাপার সেটা খুঁজে পাচ্ছেন না তো ? আমার সঙ্গে আসুন , দেখিয়ে দিচ্ছি ৷ ” আমি বিষ্মিত হয়ে বলি” কী খুঁজব ! গাড়ি ঠিক না হওয়ায় রাস্তায় চক্কর খেতে নেমেছি কিছুক্ষণের জন্য ৷ কিন্তু তুমি কে ? ” লোকটা বলল “এখানে ঘুরি এখানেই থাকি ,আমার নাম গজু ।আপনাকে কিন্তু আমি চিনেছি ; আপনি ছোটবাজারের সংস্কৃত পন্ডিত জগবন্ধু স্যারের সেই ডাক্তার ছেলেটা না ?” আমি শুনে আরও অবাক , আমাকে চিনেছে মানে তো এলাকার বহু পুরোনো লোক ! বললাম ” সবই তো জানো ; তা দুর্গাপূজার রাতে তুমি একা শ্মশানে কী করছ ?” ও বলল “নতুন মড়ার অপেক্ষায় আছি ।” ” মানে তুমি ডোম , শবদাহের কাজ করো ?” ” আগে করতাম ৷ তবে আজকাল শুধু মানুষের সেবা করে বেড়াই ৷ দেখলাম আপনি দিশাহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ; তাই ভাবলাম যে আপনাকে একটু সাহায্য করে আসা যাক ? আসুন , আমি পৌঁছে দিচ্ছি ঠিক জায়গায় ৷” কি মুস্কিল , কোন ঠিক জায়গায় আমাকে নিয়ে যেতে চাইছে এই লোকটা ? কিছুই তো খুঁজছি না , তাছাড়া এতবড় শ্মশানে ঢুকে হারা উদ্দেশ্যে যাবটাই বা কোথায় ? অদ্ভূত ; তাও যেন সম্মোহিত করে বশ করার মতন আমাকে ডেকে শ্মশানের মধ্যস্হলে নিয়ে চলল নির্জন রাতের এই আশ্চর্য শ্মশানচারী গজু ! অন্ধকারের ভ্রুকুটির মাঝে অজানা বিশ্বাসে ভর করে ওর পাশাপাশি আমিও চলতে লাগলাম ৷ ডাক্তার হবার কারণে কারুকে অবিশ্বাস করতে সহজে মন চায় না ! অন্ধকার ফাঁকা মাঠ , শিয়াল ছাড়া অন্য আর প্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই ; এমনই এক ধু ধু প্রান্তে আমাকে এনে হাজির করাল গজু ৷ তারপর একদিকে আঙুল দেখিয়ে বলল “ওই জায়গাটা দেখে নিন যেখানে আপনার বাবাকে পোড়ানো হয়েছিল ! আপনার হয়তো কিছুই মনে নেই কিন্তু আমি জায়গাটা চিনি ৷” আমি বাকরুদ্ধ ! এ কার সাথে ঘুরছি , এ মানুষ না অন্য কিছু ? গজু নির্বিকার ৷ বলল “আপনার মারটা একটু দুরে ৷ আর ডানপাশে যাকে পোড়ানোর জমি দেখছেন ,তিনি গনেশ দত্ত ; জীবিতকালে আপনার বন্ধু ছিলেন ৷ বেঁচে থাকার সময় আপনাদের মধ্যে শ্যামলীকে ঘিরে একটা ত্রিকোন প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল , সেটা নিশ্চয়ই ভোলেন নি ? এর ঠিক পাশের মাটিতেই একদিন জ্বলেছিল শ্যামলীর চিতাখানা ! যান , একটু এগিয়ে দেখে আসুন !” এক ভয়ংকর মানসিক দ্বন্দের মধ্যে আমি গুটিগুটি এগিয়ে গেলাম ৷ হ্যাঁ , আমার প্রথম জীবনের প্রায় প্রত্যেকেই এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে এই শ্মশানে ! মা বাবা দাদা বন্ধু , এমনকী বিয়ে না হওয়া প্রেমিকা অবধি ! বড্ড দুর্ভাগ্যজনক , কিন্তু শ্যামলী সেদিন বিষ খেয়ে মরল কেন ? আমাকে বললে তো আমিই ওর জীবন থেকে সরে আসতাম ; সে থাকত গনেশকে নিয়ে সুখে ? শ্যামলীর সেই পুরোনো দাহস্হল থেকে সরে আসার মুহূর্তে হঠাৎ একটি মহিলাকন্ঠ ভেসে এল ” তুমি কবে শুতে আসবে গো ? সত্যি বলছি আমার একা থাকতে আর একদমই ভাল লাগছে না ৷” এতদিন পরেও বুঝতে অসুবিধা হল না যে এটা শ্যামলীর কন্ঠস্বর ! ত্রস্হভাবে এদিক-ওদিক চেয়ে দেখি গজু নিরুদ্দেশ , তার টিকিটিও কোথাও নেই ৷ হঠাৎ মাথাখানা কীরকম ঘুরে উঠল , আমি সেখানে অর্থাৎ সেই শ্মশানেই কপাল চেপে বসে পড়লাম !

যোগাযোগ — অনিন্দ্য শঙ্কর রায়

ঠিকানা — Flat No 07 Prantik Abas M — 3 Prantika Po — Garia Garden Garia Kolkata — 700084

(ph– 9433710088 )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *