কলকাতাজেলারাজ্যলাইফস্টাইলসাহিত্য সংস্কৃতি

সুবে বাংলার প্রথম দুর্গা মন্দির (সৌরভ সিংহ)

মা চিত্তেশ্বরী

এই বাংলা 24, সৌরভ সিংহ:-সুবে বাংলার প্রথম দুর্গা মন্দির।মধ্যযুগ সেইসময় ঘন জঙ্গলে ভরা অধুনা চিৎপুর অঞ্চল। সূর্যের আলো অবধি ঢুকতো না সেখানে।নদীর কলতান আর কিছু মৎস্যজীবী এবং মাঝে মধ্যে সাধুদের আনাগোনা,নির্জন স্থানে সাধনার জন্য।সেই সময় এই অঞ্চলে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ডাকাত ছিলেন চিত্তেশ্বর রায়,যাকে লোকে বলতো চিতে ডাকাত।মধ্যযুগে ডাক ছিল সরকারি রাজস্ব এবং তথ্য পরিবহন ব্যবস্থা, সেই সঙ্গে চিঠিপত্রও পাঠানো যেত।এই ডাক ব্যবস্থায় হানা দিয়ে যিনি সুলতান বাদশা নবাবের রাজস্ব লুট করে নিতেন, তিনিই ডাকাত। মধ্যযুগে বাংলার হিন্দুদের মধ্যে অনেকেই ডাকাত, যে কারণে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের ইংরেজরা টেরোরিস্ট বলত।আমরা বাংলায় একটা কথা সবসময় শুনতে পাই,’ডাকাবুকো’,অর্থাৎ প্রচন্ড সাহস যার।এইসব ডাকাতরা বাস্তবে ছিলেন রবিনহুড, অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতেন। তেমনি ছিলেন চিত্তেশ্বর রায়।বাংলায় ডাকাতরা বরাবরই শাক্ত উপাসক,তার প্রমাণ বহু আছে। এমনকি অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা ছিলেন শাক্ত উপাসক।চিৎপুর ঘন জঙ্গলে ডাকাত আর হিংস্র জন্তুতে ভরা।একদিন দেখলেন,গঙ্গার বুক চিরে ভেসে আসছে নিমকাঠ।মা অন্তর প্রাণ,তাই চিত্তেশ্বর রায় ঠিক করলেন নিমকাঠের দুর্গাপ্রতিমা গড়ে পুজো করবেন।গড়লেন দেবী, অপূর্ব সৌন্দর্যে ভরা দেবী,অনুপম এক পুরাকীর্তি৷ শিলে বাটা তাজা হলুদের মতো গায়ের রং৷ ত্রিনয়নে সংহারের তেজ নেই৷ ত্রিশূল বিঁধেছেন সবুজ অসুরকে৷।সেই থেকেই দেবীর পরিচিতি ‘চিত্তেশ্বরী’ নামে। আর এলাকার নাম ‘চিৎপুর’। চিতে ডাকাতের কাল ফুরোলে দেবী দীর্ঘকাল অবহেলায় পড়েছিলেন। সন্ন্যাসী নৃসিংহ ব্রহ্মচারী স্বপ্নাদেশ পেয়ে ১৫৮৬ সালে মূর্তিটি উদ্ধার করে একটি কুঁড়েঘরে পুজো শুরু করেন। এলাকার জমিদার মনমোহন ঘোষ পরে মন্দির নির্মাণ করেন। নামজাদা ধনী গোবিন্দরাম মিত্র মন্দির আরও বড় করেন। নৃসিংহ ব্রহ্মচারী অবিবাহিত হওয়ায় গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মন্দিরের সেবার ভার ছিল দীর্ঘকাল। অষ্টম প্রজন্মের সেবাইত শ্যামসুন্দর ব্রহ্মচারী বিবাহ করেন। তাঁর দুই কন্যা— যদুমণি ও ক্ষেত্রমণি। ক্ষেত্রমণির বিবাহ হয় হালিশহরের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারে। সেই বংশই এখনও পর্যন্ত মন্দিরের সেবা করে আসছে।প্রতি বছর দেবীর অঙ্গরাগ হয়৷ মহালয়ার আগের সন্তাহে দিন পাঁচেক চলে তাঁর রূপটান৷ সাদা সিংহটি চিতে ডাকাতের মতো ক্ষিপ্র৷ দশভুজার পায়ের কাছে একটি বাঘের মূর্তি৷ দক্ষিণ রায় এখানে পুজো পান৷ জঙ্গলে হিংস্র প্রাণীর উপদ্রব ছিল চিতের কালে , তাই বাঘ -দেবতাকে তুষ্ট করার চেষ্টা৷রায়চৌধুরী পরিবার তাঁর নিত্যপুজো করে৷ রোজ হয় ভোগ,আরতি৷ ভোগে মাঝেমধ্যেই থাকে মাছ৷‘চিতে ডাকাত এখানে নরবলি দিতেন,আসলে ডাকাত সর্দার বস্তুত একজন স্থানীয় রাজার সমতুল্য। তন্ত্রসারে বলা হয়েছে নরবলি একমাত্র রাজা দিতে পারেন, আর কেউ অধিকারী নয়। আমরা জানি বাংলার ডাকাতরা নরবলি দিয়ে মায়ের পুজো করতেন, যা অতীব ভয়াবহ। কিন্তু তা হল পরোক্ষ প্রমাণ যে এই ডাকাতদলের প্রধান নায়ক রাজক্ষমতার দাবিদার ছিলেন মধ্যযুগের সেই অন্ধকার সময়ে। একটা ঘেরা জায়গা ওই স্যাঁতসেঁতে মাটি , হালকা শ্যাওলার ছোপে যেন কোনও অদৃশ্য হাঁড়িকাঠ গাঁথা।‘চিত্তেশ্বরীর মন্ত্র একটু আলাদা৷ দেবীর বুকে লেখা রয়েছে বীজমন্ত্র৷সেবাইতদের উচ্চারণ করা নিষেধ৷আর শারদোৎসবের চারদিনের বাড়তি আয়োজন বলতে ভোগ,বলি৷ সন্তমী -অষ্টমী -নবমীতে সাতভাজা -আটভাজা -ন ’ভাজা৷ চালকুমড়ো ,বাতাবি লেবু বলি দেওয়া হয়৷ ছাগ -মোষ বলিও বন্ধ হয়েছে বহু বছর৷ একদা এই পুজোয় নরবলি হয়েছে। পরে ছাগবলি হত। এখন ফলবলি হয়। কাশিপুর গান শেল ফ্যাক্টারির উল্টোদিকে ইতিহাস কে সাক্ষী দাঁড়িয়ে আছে,সুবে বাংলার প্রথম দুর্গা মন্দির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *